এইচএসসি পরীক্ষার দুটি বিকল্প: প্রশ্ন হবে সবার জন্য নমনীয়

করোনা পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ব্যা’ঘাত ঘটায় প্রায় ১৩ লাখ শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবক উদ্বিগ্ন। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষা বাতিল করেছে সরকার। অবস্থা বিবেচনায় বিদ্যালয় কর্তৃক শ্রেণি পরীক্ষা নিয়ে ফল প্রস্তুত ও পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এইচএসসি পরীক্ষা অন্যান্য শ্রেণি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ এই পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়া ও ফলের ওপর নির্ভর করেই বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেলে ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। দ্রুত পরীক্ষা নিতে না পারলে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা শিক্ষাবর্ষ গ্যাপ পড়ার আশঙ্কা, শিক্ষার্থীদের সেশনজটের সম্মুখীন হওয়া এবং পরবর্তী জীবনে কর্ম পেতেও বয়সের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এসব পরীক্ষার্থীর মানসিক অবস্থার দিকে নজর দেওয়া। তারা বারবার শেষ প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। কিন্তু বারবার প্রতিষ্ঠান খোলার তারিখ পরিবর্তনে তাদের দুশ্চিন্তা বেড়ে যাচ্ছে নিশ্চয়। এহেন অবস্থায় শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যৎ জীবন, স্বপ্ন ও কর্ম নিয়ে অস্বাভাবিক ও মানসিক বিষণ্ণতায় ভুগতে পারে এবং জাতীয়ভাবে ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি মেধাবিকাশ, উন্নয়নসহ সামগ্রিক কাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এজন্য পরিস্থিতি যত খারাপই হোক, নমনীয় ও বিকল্প পদ্ধতি অবলম্বন করে শিক্ষার্থীদের এই পরিস্থিতি থেকে আশু মুক্তি দেওয়া জরুরি। এদিকে শিক্ষামন্ত্রীও বিকল্প পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য সংশ্নিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন। উন্নত শিক্ষা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর দেশগুলো এই পরিস্থিতিতেও এই জাতীয় পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে হাতে থাকা বিকল্প পদ্ধতি অবলম্বন করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কাঠামো বা কর্মজীবনে প্রবেশের জন্য এই স্তরে পরীক্ষা গ্রহণ ও মূল্যায়নের পর একটা মান নির্ধারণ জরুরি। এজন্য পরীক্ষা আবশ্যক। এই সার্বিক অবস্থা বিবেচনা, বাংলাদেশের সক্ষমতা ও উন্নত দেশের বিভিন্ন মডেল বিবেচনা করে জরুরি প্রয়োজনে অনিশ্চিত পরিস্থিতি থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্তির জন্য দুটি বিকল্প পদ্ধতির সুপারিশ করছি। মডেল এক. গ্রামভিত্তিক পরীক্ষা। শহরে ঘনত্ব হলেও পল্লি অঞ্চলে অধিকাংশ এলাকার একটি গ্রামে এক, দু-চারজন বা সর্বোচ্চ ১০ জন পরীক্ষার্থী আছে মাত্র। এই পদ্ধতিতে পরীক্ষার্থী তার নিজের গ্রামের বা ওয়ার্ডের (শহরে) প্রাইমারি স্কুল বা হাই স্কুল বা কলেজে বসেই পরীক্ষা দেবে। এতে সব শিক্ষার্থী এক পরীক্ষা কেন্দ্রে একত্রিত করার দরকার হবে না, আবার সব শিক্ষককেও পরীক্ষার দায়িত্ব পালন করতে হবে না।পরীক্ষার্থী তার বাড়ি বা বাসার নিকটবর্তী স্কুলে বসে পরীক্ষা দেবে। পরীক্ষা হবে পরপর মোট দুই অথবা তিন দিনে। পরীক্ষার প্রশ্ন হবে সবার জন্য নমনীয় অর্থাৎ, প্রতিটি বিষয়ে সৃজনশীল বা বিদ্যমান প্রশ্ন থেকেই চারটি প্রশ্ন থাকবে। কিন্তু কোনো প্রশ্নই এমন হবে না যেন, বই, গাইড দেখে লিখতে পারে বরং এমন হবে যাতে শিক্ষার্থী তার মেধা যোগ্যতা বা সৃষ্টিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে উত্তর দিতে পারে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীরা দুটি প্রশ্নের উত্তর দেবে। একটি উত্তরের জন্য ৩০ মিনিট করে অর্থাৎ, প্রতিটি বিষয়ে এক ঘণ্টা পরীক্ষা হবে। একটি প্রশ্নের উত্তর লেখার জন্য মাত্র দুই পৃষ্ঠা বরাদ্দ থাকবে। উত্তরপত্রের ওপরেই প্রশ্ন লেখা থাকবে এবং প্রশ্নের ঠিক নিচ থেকেই উত্তর লেখা শুরু করবে।

পরীক্ষার্থীর কলেজে বিস্তারিত রেকর্ড আছে কে কোন গ্রামের। কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণাধীন সব কলেজের প্রধানদের নিয়ে পরীক্ষা পরিচালনা কমিটি গঠন করবে এবং কলেজের প্রধানরা শিক্ষার্থীদের রেকর্ডসহ সংশ্নিষ্ট গ্রামের পরীক্ষা নেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের (এক থেকে দু’জন) শিক্ষার্থীর সক তথ্য ও পরীক্ষা গ্রহণের রুটিন দিয়ে পত্র পাঠাবে। তার আগে জাতীয়ভাবে ব্যাপক প্রচারের ভিত্তিতে সব মাধ্যমে পরীক্ষা গ্রহণের তারিখ ও রুটিন ঘোষণা ও নির্দেশনা প্রচার করতে হবে। নির্ধারিত দিনে বা আগের দিন কেন্দ্র থেকে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রাইমারি স্কুল, হাই স্কুলের শিক্ষকরা সংশ্নিষ্ট গ্রামে পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা নিয়ে উত্তরপত্র সংশ্নিষ্ট কেন্দ্রপ্রধানের কাছে জমা দিয়ে আসবেন।মডেল দুই, উপরোক্ত পদ্ধতিতে মনিটরিং যদি কঠিন মনে হয় তবে প্রশ্ন কাঠামো ওপেন বুক এপাম সিস্টেমে অথবা শুধু নৈর্ব্যক্তিক হতে পারে। যেহেতু এই পরীক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা অভ্যস্ত নয় তাই প্রথমোক্ত মডেল কার্যকরী হতে পারে। বোর্ডগুলো পোস্ট অফিসের মাধ্যমে পরীক্ষকদের কাছে উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য পাঠাবেন, যাতে কাউকে শহরে গিয়ে আনতে না হয়। জাতীয়ভাবে নির্দেশনা থাকবে নমনীয় পদ্ধতিতে মূল্যায়নের জন্য। যাতে কোনো শিক্ষার্থীর প্রত্যাশা ভঙ্গ না হয়।গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হলো, শহরে একজন শিক্ষার্থীর একজন অভিভাবক আসতে পারবেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং তাদের অবস্থানের নির্ধারিত দূরত্ব বজায় রেখে বসে থাকতে হবে। আরেকটি বিষয় হলো, কোনো কারণে যদি কোনো পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারে, এজন্য দ্বিতীয় সুযোগ থাকবে। পরীক্ষার্থী তার নিকটস্থ কেন্দ্রে ফোন দিয়ে জানালে কেন্দ্রপ্রধান বোর্ড প্রদত্ত বিকল্প ভিন্ন প্রশ্নপত্রে শিক্ষার্থীর পরীক্ষা নিতে ওই গ্রামের শিক্ষককে দায়িত্ব দেবেন। শিক্ষার্থীদের প্রাকটিক্যাল খাতা দেখে স্কুলশিক্ষকরা মার্কস বোর্ডে পাঠাবেন, কোনো প্রাকটিক্যাল পরীক্ষা নেওয়া যাবে না। অথবা জাতীয়ভাবে সবাইকে প্রাকটিক্যালে সমান নম্বর দেওয়া যেতে পারে।

দেশের প্রায় সব গ্রামে প্রাইমারি স্কুল আছে, দু-তিন গ্রাম মিলে হাই স্কুল এবং ইউনিয়ন বা উপজেলায় উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল বা কলেজ আছে। শিক্ষকরা অধিকাংশ একই গ্রাম বা পার্শ্ববর্তী গ্রামের। সারাদেশে যদি এক দিনে সাত-আট কোটি মানুষের ভোটগ্রহণ সম্ভব হয়, তবে ভিন্ন ভিন্ন স্কুলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরীক্ষা গ্রহণ কেন সম্ভব নয়? আমাদের যেহেতু এই বৈশ্বিক দুর্যোগ মোকাবিলায় শিক্ষাক্ষেত্রে ওই ধরনের প্রস্তুতি ছিল না বা প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও অবকাঠামো শক্তিশালী নয়, সুতরাং এই পরিস্থিতিতে আমাদের শিক্ষার্থীদের মানসিক ভঙ্গুর অবস্থা থেকে উত্তোরণ ও তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের স্বপ্ন জিইয়ে রাখতে উপরোক্ত মডেল বিবেচনা, পরিমার্জন ও পরিবর্ধন করে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত বিবেচনা করা যেতে পারে।*লেখক: পিএইচডি গবেষক, শিক্ষাবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, গাজী ইউনিভার্সিটি, আঙ্কারা, তুরস্ক

Author: admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *